হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোপর্ট অনুযায়ী, ইরানের হাওজা ইলমিয়ার সর্বোচ্চ পরিষদের সদস্য এবং বিশেষজ্ঞ পরিষদের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আয়াতুল্লাহ মোহসেন আরাকি ইরাকের রাজনৈতিক নেতাদের উদ্দেশে পাঠানো এক বার্তায় এ মন্তব্য করেন।
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
ইরাকের সম্মানিত রাজনৈতিক নেতাদের প্রতি-আল্লাহ তাআলা তাঁদের সরল পথে পরিচালিত করুন।
প্রিয় ইরাক ও সমগ্র অঞ্চল বর্তমানে ইতিহাসের এক বিপজ্জনক সন্ধিক্ষণ অতিক্রম করছে। এই সময়ে কোনো ধরনের অসতর্কতা, অবহেলা, উদাসীনতা কিংবা শৈথিল্য গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, এই সময়কালই ইরাক ও সমগ্র অঞ্চলের ভবিষ্যতের ভিত্তি নির্মাণ করবে।
এখানে শরিয়ত ও বিবেক-বুদ্ধির এমন কিছু সুস্পষ্ট মূলনীতি রয়েছে, যেগুলো উপেক্ষা করা কিংবা সেগুলোর সীমা অতিক্রম করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। নিচে সেগুলো তুলে ধরা হলো।
শরিয়তের প্রথম মূলনীতি
আল্লাহ তাআলা বলেন: তোমরা সীমালঙ্ঘন করো না। নিশ্চয়ই তোমরা যা করো, তিনি তা দেখেন। আর যারা জুলুম করেছে, তাদের প্রতি ঝুঁকে পড়ো না; অন্যথায় আগুন তোমাদের স্পর্শ করবে। আল্লাহ ছাড়া তোমাদের কোনো অভিভাবক নেই; অতঃপর তোমরা সাহায্যও পাবে না। সুরা হুদ, আয়াত ১১২–১১৩
এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে, যুক্তরাষ্ট্রের নীতির কাছে আত্মসমর্পণ করা এবং তার আনুগত্য করা সীমালঙ্ঘন ও জালিমের ওপর নির্ভর করারই শামিল। এর পরিণতি হবে জাহান্নামের আগুনে পতিত হওয়া, আল্লাহর সাহায্য থেকে বঞ্চিত হওয়া এবং পরকালের শাস্তির আগেই দুনিয়ার জীবনে দুর্ভাগ্যের সম্মুখীন হওয়া।
শরিয়তের দ্বিতীয় মূলনীতি
আল্লাহ তাআলা বলেন: আর আল্লাহ কখনো মুমিনদের বিরুদ্ধে কাফিরদের জন্য কোনো পথ রাখবেন না। সুরা আন-নিসা, আয়াত ১৪১
বর্তমানে কিছু ইরাকি রাজনীতিকের মধ্যে যে অপমানজনক আত্মসমর্পণের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা মুমিনদের ওপর কাফিরদের আধিপত্য বিস্তারের পথ খুলে দেওয়ার অন্যতম স্পষ্ট উদাহরণ।
এর অর্থ হলো, এই আধিপত্য মেনে নেওয়া এবং তার কাছে নতি স্বীকার করা নিঃসন্দেহে ঈমানের গণ্ডি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার শামিল।
শরিয়তের তৃতীয় মূলনীতি
আল্লাহ তাআলা বলেন: হে মুমিনগণ! তোমরা ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের অভিভাবক ও মিত্ররূপে গ্রহণ করো না। তারা পরস্পরের মিত্র। তোমাদের মধ্যে যে তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করবে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত হবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ জালিম সম্প্রদায়কে সৎপথে পরিচালিত করেন না।
অতঃপর তুমি দেখবে, যাদের অন্তরে ব্যাধি রয়েছে, তারা তাদের সঙ্গে মিত্রতা স্থাপনে তৎপর হয়ে ওঠে এবং বলে, ‘আমরা আশঙ্কা করছি, কোনো বিপদ আমাদের ওপর আপতিত হবে।’ অতঃপর আশা করা যায়, আল্লাহ বিজয় অথবা তাঁর পক্ষ থেকে কোনো নির্দেশ নিয়ে আসবেন। তখন তারা নিজেদের অন্তরে যা গোপন রেখেছিল, সে জন্য অনুতপ্ত হবে। সুরা আল-মায়িদা, আয়াত ৫১–৫২
এগুলো শরিয়তের সুস্পষ্ট মূলনীতি, যা দুটি পথের মধ্যকার সীমারেখা নির্ধারণ করে: একদিকে ঈমানের পথ-সত্যবাদীদের পাশে দাঁড়ানো; অন্যদিকে কুফর ও মুনাফিকির পথ-কাফির ও ঔদ্ধত্যকারী শক্তিগুলোর পাশে দাঁড়ানো।
আজ আপনারা এই দুই পথের একটিকে বেছে নেওয়ার সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছেন। এখানে তৃতীয় কোনো বিকল্প কল্পনা করা যায় না।
তবে বিবেক-বুদ্ধিরও কিছু সুস্পষ্ট ও স্বতঃসিদ্ধ মূলনীতি রয়েছে। এর কয়েকটি নিচে তুলে ধরা হলো।
বিবেক-বুদ্ধির প্রথম মূলনীতি
জালিম ও আধিপত্যবাদী শক্তির শাসন থেকে মুক্তি অর্জন করা তার সামনে আত্মসমর্পণ ও নতি স্বীকার করার চেয়ে উত্তম; উপরন্তু, মুক্তির জন্য যে মূল্য দিতে হয়, তা আত্মসমর্পণের পরিণতির তুলনায় অনেক কম।
অসংখ্য অভিজ্ঞতা এ বক্তব্যের সত্যতা প্রমাণ করে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো আপনাদের চোখের সামনে থাকা ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের অভিজ্ঞতা। একইভাবে, সাদ্দামের শাসনামলের অভিজ্ঞতাও আপনাদের খুব বেশি দূরের নয়।
বিবেক-বুদ্ধির দ্বিতীয় মূলনীতি
শত্রুর আনুগত্য করার পরিণতি হলো তার জুলুম ও সীমালঙ্ঘন আরও বৃদ্ধি পাওয়া।
শত্রুর সামনে ছাড় দিলে তার অনিষ্ট থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে-এমন ধারণা একটি মারাত্মক ভুল। বরং অতীত ও বর্তমানের শত শত মানবিক অভিজ্ঞতা প্রমাণ করেছে, এ ধরনের নতি স্বীকার শত্রুর ঔদ্ধত্য, দুঃসাহস ও নিষ্ঠুরতাই বাড়িয়ে দেয়।
বিবেক-বুদ্ধির তৃতীয় মূলনীতি
প্রতিটি জাতির স্বার্থ নিহিত রয়েছে নিজস্ব নীতি নির্ধারণ, রাষ্ট্র পরিচালনা, অর্থনীতি, সংস্কৃতি এবং অন্যান্য জাতির সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্কের বিষয়ে নিজেরাই সিদ্ধান্ত নেওয়ার মধ্যে।
কিন্তু কিছু ইরাকি রাজনীতিকের অবস্থান থেকে ইরাকি জনগণের স্বার্থ উপলব্ধির ক্ষেত্রে এক গুরুতর ভুল প্রকাশ পাচ্ছে। আমরা শুনেছি, তাঁদের কেউ কেউ দাবি করেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের কাছে নতি স্বীকার করাই ইরাকের স্বার্থের অনুকূল!
প্রশ্ন হলো, ইরাকি জনগণের জন্য কি এটা কল্যাণকর যে, তারা নিজেদের প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নিয়োগের ক্ষেত্রেও স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না?
ইরাকের তেলসম্পদ থেকে অর্জিত আয় যুক্তরাষ্ট্রের হাতে চলে যাবে, অথচ নিজেদের সম্পদ ও অর্থনীতি সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার থাকবে না-এটা কি ইরাকি জনগণের স্বার্থের অনুকূল?
প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক নির্ধারণের ক্ষেত্রেও কি ইরাকের নিজস্ব কোনো কর্তৃত্ব থাকবে না? বরং তাদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার সিদ্ধান্তও কি ইরাকের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে?
অথচ এসব প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে ইরাকের বিপুল অভিন্ন স্বার্থ রয়েছে। বিশেষ করে এমন এক প্রতিবেশী দেশ রয়েছে, যে ইরাকের সবচেয়ে বড় সংকটের সময়-যখন যুক্তরাষ্ট্রের শত্রুদের সমর্থনপুষ্ট তাকফিরি গোষ্ঠীগুলো ইরাকের ওপর আক্রমণ চালিয়েছিল-আন্তরিকতার সঙ্গে ইরাকের পাশে দাঁড়িয়েছিল।
তাহলে কিছু ইরাকি রাজনীতিক কীভাবে মনে করেন যে, মার্কিন শত্রুর কাছে আত্মসমর্পণ করা এবং নিজেদের সবচেয়ে আন্তরিক প্রতিবেশীর সঙ্গে শত্রুতা সৃষ্টি করা যুক্তিবুদ্ধি ও জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?
এ কেমন যুক্তিবুদ্ধি, যা রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতার ক্ষেত্রে ইরাকি জনগণের স্বার্থ বিসর্জন দেয়? শত্রুদের সন্তুষ্ট করার জন্য সেই বন্ধু ও সমর্থকদের বলি দেয়, যারা কঠিন সময়ে এবং নিঃসঙ্গতার মুহূর্তে ইরাকের পাশে দাঁড়িয়েছিল?
যুক্তরাষ্ট্র কি ইরাকি জনগণের সবচেয়ে বড় শত্রু নয়? এই দেশটিই কি ইরাককে ধ্বংস করেনি এবং দেশটির কয়েক হাজার তরুণ, পুরুষ, নারী ও শিশুকে রক্তাক্ত মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়নি?
এটা কি সেই যুক্তরাষ্ট্র নয়, যার বর্তমান প্রেসিডেন্টের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, দায়েশ বা আইএসআইএসকে অস্ত্র ও সহায়তা দেওয়া এবং গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ভূমিকা ছিল? সেই গোষ্ঠীই ইরাকি সন্তানদের শিরশ্ছেদ করেছে, শিশুদের এতিম করেছে, নারীদের বাস্তুচ্যুত করেছে, ইরাকি জনগণের রক্ত ও সম্পদকে নিজেদের জন্য বৈধ মনে করেছে এবং দেশটির স্থলভাগ, আকাশসীমা, সমুদ্র ও ভূখণ্ডের ওপর সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করেছে।
ইরাকি জনগণ অপমান ও লাঞ্ছনা মেনে নেবে না
হে ইরাকের রাজনৈতিক নেতারা! জেনে রাখুন, ইরাকি জনগণ একটি মর্যাদাবান জাতি। তারা কখনো অপমান ও লাঞ্ছনা মেনে নেবে না এবং নিজেদের ঈমান ও ধর্ম থেকে সরে আসবে না।
এই কি সেই জনগণ নয়, যারা নিজেদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের আহ্বানে সাড়া দিয়েছিল এবং ধর্ম রক্ষা ও মাতৃভূমিকে মুক্ত করার জন্য লাখো মানুষের গণজাগরণে অংশ নিয়েছিল? এমনকি তাদের এই পদক্ষেপ শত্রুকে বিস্মিত ও দিশেহারা করে দিয়েছিল!
এই কি সেই হুসাইনি ও আলাভি জনগণ নয়, যারা সাইয়্যেদুশ শুহাদা ইমাম হুসাইন (আ.)-এর আদর্শ অনুসরণ করে পবিত্র আরবাঈনের মহাসমাবেশে মজলুমদের সমর্থন এবং জালিম ও আধিপত্যবাদীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার লক্ষ্যে মানব ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম সমাবেশ গড়ে তুলেছে?
এই কি সেই মহান জাতি নয়, যারা চৌদ্দ শতাব্দী ধরে আমিরুল মুমিনিন ইমাম আলী (আ.)-এর বেলায়াতের ওপর অবিচল রয়েছে? এ পথে অসংখ্য আত্মত্যাগ, শাহাদাত এবং জানমালের ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও তারা সর্বদা জুলুম ও সীমালঙ্ঘনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে এসেছে।
হে ইরাকের রাজনৈতিক নেতারা! সতর্ক হয়ে যান। অদূর ভবিষ্যতে ইরাকি জনগণ যুক্তরাষ্ট্রের ঔদ্ধত্য ও সীমালঙ্ঘনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবে এবং তা চূর্ণবিচূর্ণ করে দেবে।
এই জনগণ তাদেরও প্রত্যাখ্যান করবে, যারা যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যের সময় এই মজলুম জনগণের ভাগ্য ও ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণের ভার তার হাতে তুলে দেওয়া এবং জনগণের অপমান ও লাঞ্ছনাকে মেনে নিয়েছিল।
আল্লাহর সাহায্য ও আমিরুল মুমিনিনের বাণী
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন: আল্লাহ অবশ্যই তাকে সাহায্য করবেন, যে তাঁকে সাহায্য করে। নিশ্চয়ই আল্লাহ মহাশক্তিধর, পরাক্রমশালী। সুরা আল-হাজ্জ, আয়াত ৪০
আমিরুল মুমিনিন ইমাম আলী (আ.) বলেছেন: আল্লাহর শপথ! যে ব্যক্তি নিজের শত্রুকে নিজের ওপর কর্তৃত্ব করার সুযোগ দেয়, যাতে সে তার গোশত খেয়ে ফেলে, তার হাড় ভেঙে দেয় এবং তার চামড়া ছিঁড়ে ফেলে-তার অক্ষমতা অত্যন্ত প্রবল এবং তার বুকের ভেতরে ধারণ করা হৃদয় অত্যন্ত দুর্বল।
তুমি চাইলে এমন হতে পারো; কিন্তু আমি-আল্লাহর শপথ-শত্রুকে এমন সুযোগ দেওয়ার আগেই মাশরাফি তরবারি দিয়ে এমন আঘাত হানব, যাতে মাথার খুলির হাড় উড়ে যাবে এবং বাহু ও পা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। নাহজুল বালাগা, খুতবা ৩৪
ওয়াসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।
মোহসেন আরাকি
১৪ জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি
আপনার কমেন্ট